এমন মুমূর্ষূ অবস্থাতেও দুইদিনে অন্তত ৭০ জন লোক তাকে দিন থেকে রাত, রাত থেকে দিন নানা প্রশ্নবাণে জর্জরিত করেছে।

দুপুরে খাবার সময়টুকু দেয় নাই, দেয় নাই ঘুমাতে। কতবার, কতক্ষণ— একই প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে আমি কান্নায় ভেঙে পড়ছি। মেয়েটি থেমে যায় নাই। একবারও ভেঙে পড়ে নাই। সে শক্ত ছিল। সে সবার সব প্রশ্নের উত্তর দিছে। সবকিছু নিজে করার চেষ্টা করছে। ধর্ষকের হাত থেকে দৌড়ে পালায়ে আসছে ও। কেউ তাকে বাঁচায় নাই।

মেয়েটার এত সাহস, এত মানসিক শক্তির উৎস কি জানেন?

মেয়েটার মা।

সোমবার ভোরবেলা হাসপাতালে তাকে ঘটনা খুলে বলার পর তিনি আমার হাত ধরে শুধু একটা প্রশ্নই জিজ্ঞাসা করলেন—

ও কি বেঁচে আছে?

আমি হ্যাঁ বলতেই আমার হাত চেপে ধরে বললেন, তাহলেই হবে। আমার মেয়ে বেঁচে থাকলে সব করতে পারবে। ও যা চায়, ওর সব স্বপ্ন ও পূরণ করবে।

মেয়েটিকে দেখে প্রথম মা বলেছিলেন— কিছু হবে না মা। এমন জীবনে হয়। তুই শক্ত থাক। তুই পরীক্ষা দিতে পারবি— একটুও ভাবিস না।

তিনদিন টানা মেয়ের পাশে— মেয়েকে প্রতিনিয়ত সাহস যোগালেন, শক্তি দিলেন, আত্মীয় স্বজনের অজস্র কটুক্তির উত্তর দিলেন। এমনকি নিজের স্বামীর অসংখ্য দোষারোপের স্বীকার হলেন মা। ভুল করে কেন নামলো কুর্মিটোলা? কেউ আবার বাস স্টপেজ ভুল করে নাকি? বান্ধবীর বাসায় যাবার কী দরকার, হলের মেয়ে হলে থাকবে—কত রকম বাজে কথা যে শুনতে হলো আমাদেরকে। আমি অসুস্থ বোধ করতাম। আমি একবারও মন খারাপ করতে দেখি নাই মাকে। উল্টাে বলতেন- আরে বাহ, মানুষের বুঝি ভুল হয় না? তোমরা কখনো রাস্তা ভুল করোনি?

অজ পাড়া গাঁ থেকে উঠে আসা এই মা। আর আমার সোশ্যাল মিডিয়ার অসংখ্য অশ্লীল কমেন্ট— অসংখ্য অদ্ভুত চাহনি— এর মধ্যে মাকে দেখে মনে হয়— এই মায়েদের জন্যই এখনো আমরা বেঁচে আছি।

যাদের আমাদের নিরাপত্তা দেবার কথা, তারা তা দিতে পারে নি। একথা ভুলে যাবেন না। কক্ষনো না। মেয়েটি আমাকে বলেছে— এদেশের নয়, সব দেশের, ঢাকায় নয়, সবখানে, সন্ধ্যা সাতটায় নয়— সকাল, বিকাল, রাত, দুপুর— সবসময় একটা মেয়ে যেন নির্জন/ ব্যস্ত সব পথ ধরে হেঁটে যেতে পারে সেজন্য আজীবন লড়ে যাবে সে।

গত তিনদিন আমার জীবনের অন্যতম ভয়াবহ দিন। গত তিন দিন আমার জীবনের অন্যতম তাৎপর্যময় দিন।

সংগৃহীত