অন্যান্যঃ

জীবাণুজনিত কারণে দাঁতের গায়ে সৃষ্ট ক্ষত বা গর্তকে দন্তক্ষয় রোগ বা ডেন্টাল ক্যারিজ বলা হয়। পৃথিবীর সব দেশের প্রায় অধিকাংশ লোকেরই এক বা একাধিক দাঁত এই রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বাংলাদেশের শতকরা ৬০ জনের বেশি লোক এই রোগে আক্রান্ত। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ এই রোগকে দাঁতে পোকা লাগা বলে থাকেন, কিন্তু সত্যিকার অর্থে বিভিন্ন ধরনের অতি ক্ষুদ্র জীবাণু (যা খালি চোখে দেখা যায় না) ছাড়া কোনো পোকার অস্তিত্ব এতে পাওয়া যায়নি। বিশুদ্ধ চিনি জাতীয় খাবারের সঙ্গে এই রোগের একটি বিশেষ যোগসূত্র রয়েছে। শর্করা বা চিনিজাতীয় খাবার গ্রহণ করে নিয়মিত দাঁত পরিষ্কার না করলে দাঁতে লেগে থাকা ওই সব খাদ্যবস্তুর মধ্যে জীবাণু বংশবৃদ্ধি করে।

অম্ল বা এসিড প্রস্তুতকারী এসব জীবাণু তাদের সৃষ্ট অম্লের সাহায্য দাঁতের এনামেল ও ডেন্টিন ক্ষয়সাধন করে। দাঁতের ক্যারিজ সাধারণত প্রথমে শুরু হয় দাঁতের গায়ের কতগুলো নাজুক স্থানে অর্থাৎ যেসব স্থানে খাবার অতি সহজেই জমে থাকে। প্রাথমিক অবস্থায় আক্রান্ত ক্ষতটির এনামেলের ওপরে একটি কালো দাগ বা ফোটার মতো দেখায়। ক্রমান্বয়ে এটি একটি ছোট গর্তে পরিণত হয় এবং ওই গর্তে অতি সহজেই খাবার ও জীবাণু জমে থাকে। এভাবে ক্ষতটি ক্রমশ বড় হয়ে ডেন্টিনে প্রসারিত হয় এবং আক্রান্ত দাঁত গরম, ঠান্ডা কিংবা টক বা মিষ্টিতে শিরশির করে। এ অবস্থায় ক্ষত দাঁতটি চিকিৎসা না করলে এটি ক্রমান্বয়ে আরও গভীর হয়ে দাঁতের মজ্জা অর্থাৎ পাল্পে প্রসারিত হয়। ফলে রোগী তীব্র ব্যথা অনুভব করেন। অনেক সময় এই ব্যথা আক্রান্ত দাঁতে কি না, কিংবা ঠিক কোন জায়গায় ব্যথা করছে, তা নির্দিষ্ট করে রোগী বলতে পারেন না। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া স্বরূপ আক্রান্ত দিকের চোয়াল, কান, চোখ, কপাল ও মাথায় তীব্র ব্যথা অনুভব হতে পারে। কোনো কোনো দাঁতের ব্যথা ঘাড়, কাঁধ, বুক, হাতের কব্জি কিংবা হৎপিণ্ডে অনুভব হতে পারে।

দন্তশাঁসের (মজ্জা) প্রদাহ কয়েক মিনিট থেকে কয়েক ঘণ্টা থাকতে পারে। চিকিৎসা না করে এভাবে ব্যথা কয়েক দিন থাকলে দন্তশাঁস পচে নষ্ট হয়ে যায়। দাঁতের শাঁস নষ্ট হয়ে যাওয়ায় হঠাৎ দাঁতের ব্যথা কমে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে রোগ ভালো হয়ে গেছে বলে রোগীর ভ্রান্ত ধারণা জন্মে। অথচ এ অবস্থায় দাঁতটির চিকিৎসা না করালে কালক্রমে রোগাক্রান্ত দাঁতটি যেমন হারাতে হয়, তেমনই মুখ ও চোয়ালের নানাবিধ জটিল রোগের সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অনেক ক্ষেত্রে দাঁতের ক্যারিজের জন্য দাঁত আংশিক ভেঙে যেতে পারে। দাঁতের ভাঙা ধারালো অংশের সঙ্গে জিহ্বা ও গালের মাংসের ঘর্ষণের ফলে ক্ষতের সৃষ্টি হয়, যা চিকিৎসার অভাবে পরবর্তী সময় ক্যানসার নামক দুরারোগ্য ব্যাধিতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অভিজ্ঞ মহলের ধারণা, মুখের ক্যানসারের শতকরা ৪০ ভাগ ক্যানসার ধারালো ভাঙা দাঁত থেকেই হয়ে থাকে।

দাঁত ক্ষয় রোগের প্রতিকারঃ
আমরা জানি, রোগ প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই শ্রেয়। কাজেই যে কারণে দাঁতের ক্যারিজ বা দন্তক্ষয় রোগ হয়, সে কারণগুলো দূর করতে পারলে এ রোগের হাত থেকে সহজে রক্ষা পাওয়া যায়।

প্রতিবার খাওয়ার পর দাঁত ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে, বিশেষ করে, রাতে ঘুমানোর আগে ডেন্টাল ফ্লস (এক প্রকার বিশেষ ধরনের সুতা), টুথ ব্রাশ- পেস্ট বা মেসওয়াক দিয়ে দাঁত এবং দাঁতে লেগে থাকা খাদ্য কণা পরিষ্কার করতে হবে।

দাঁত পরিষ্কারের অর্থ শুধু দাঁত পরিষ্কারই বোঝায় না, দাঁত, মাড়ি ও জিহ্বা, দুই দাঁতের ফাঁকে লেগে থাকা খাবারসহ মুখের সর্বত্র লেগে থাকা আঠালো জীবাণুর প্রলেপ দূর করা বোঝায়।

খাওয়ার পর কেবল কুলকুচি করলে জীবাণু দূর হয় না। যেভাবে যা দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করুন না কেন, দাঁত এবং দাঁতের ফাঁকে লেগে থাকা খাবার যাতে ভালোভাবে পরিষ্কার হয়, সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে।

ঘন ঘন চিনি জাতীয় খাদ্য যেমনঃ চকলেট, বিস্কুট, আইসক্রিম ইত্যাদি মিষ্টি-জাতীয় খাবার কম খাওয়া কিংবা খাওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে মুখ পরিষ্কার করা জরুরি।
রাতে ঘুমের মধ্যে শিশুদের বোতলের দুধ কোনোভাবেই খাওয়ানো উচিত নয়। কোনো বিশেষ কারণে যদি খওয়াতেই হয়, তবে সে ক্ষেত্রে শিশুর দাঁত সঙ্গে সঙ্গে ভেজা পাতলা কাপড় দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে।

ছয় মাস পর পর অভিজ্ঞ দন্ত চিকিৎসকের উপদেশ ও পরামর্শ নেওয়া উচিত।

বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় দাঁতের ক্যারিজের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো যায়। যেমন—খাবার পানিতে পরিমাণমতো ফ্লুরাইডযুক্ত করা, দাঁতের গায়ে ফ্লুরাইডের দ্রবণ বা জেল লাগিয়ে দেওয়া, ফ্লুরাইডের দ্রবণ দিয়ে কুলি করা, ফ্লুরাইডযুক্ত টুথপেস্ট ব্যবহার করা, দাঁতের নাজুক স্থানে আগাম ফ্লুরাইডযুক্ত ফিলিং করিয়ে নেওয়া ইত্যাদি।

ব্যথার কারণে দাঁত ফিলিং করা সম্ভব না হলে কিংবা ফিলিং করার পর ব্যথা শুরু হলে অথবা দাঁতের শাঁস নষ্ট হয়ে মাড়ি ও চোয়াল ফুলে গেলেও বর্তমানে দাঁতটিকে না তুলে বিশেষ এক আধুনিক চিকিৎসা রুট ক্যানেলের মাধ্যমে দাঁতটি অপারেশন করে টিকিয়ে রাখা সম্ভব।