মতামতঃ

 

এমনই এক হাড়
হিম করা শীতকালীন পরবে মানুষের সমবেত এক মূঢ়তার, সার্বিক বোধহীনতার এক নিদর্শন হল পুরুলিয়ার পাড়া থানার তেঁতুলহিটি গ্রামের এক ঘটনা।

দীর্ঘদিন ধরে মানুষের লৌকিক বিশ্বাস যে তেঁতুলহিঁটি গ্রামের এক পুরানো গাছের মধ্যে আছে যাত্রাবুড়ি নামে এক অপদেবতা। তাকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য প্রতিবছর মকরের পরের দিন যাত্রার দিন পালন করা হয় এক অদ্ভুত ধরনের উৎসব৷

সারাবছর ধরে এলাকার মানুষ যাত্রাবুড়ির কাছে মানত করে নিজেদের কামনা বাসনার কথা। যাত্রাবুড়ির কৃপায় অভীষ্ট ফল হলে আজকের দিনে ঐ গাছের মাঠে নিয়ে যায় একটা ভেড়া বা মুরগি৷

কয়েকশত মানুষ জড়ো হয় সেই মাঠে। মানতকারীরা তাদের ভেড়া বা মুরগিকে মাঠে ছেড়ে দেয়৷ মুরগি হলে আকাশের দিকে ছুঁড়ে দেয়, ভেড়া হলে মাঠে ছেড়ে দেয়৷

এরপর মাঠে উপস্থিত শত শত মানুষ মুরগি বা ভেড়াটির দিকে তেড়ে যায়। ঠিক যেন মাসাইমারার বা কিরিংবাটির জঙ্গলে ওয়াইল্ড বিস্ট, জেব্রা, বুনো মোষের পিছনে বন্য কুকুর, একদল সিংহ বা হায়েনা তাড়া করে। এরপর জীবন্ত ভেড়া বা মুরগির শরীরের বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন জন টেনে ফেলে।

ভেড়ার চারটি পা চারটি দলের লোক চারদিকে টেনেও ধরে ও ভেড়াটি ছিন্নভিন্ন হয়ে চার টুকরো হয়ে যায়। পরে ঐ চার টুকরো আবার একই ভাবে টুকরো টুকরো হয়।

মুরগী হলে উপরে উড়ন্ত অবস্থায় তার পালক বা পা ধরে টেনে খণ্ডবিখণ্ড করে দেওয়া হয় জীবন্ত মুরগির শরীর। এইভাবে জীবন্ত প্রানীগুলিকে আস্ত থেকে মাংসের টুকরো টুকরো করে যে যেমন পারে বাড়ি নিয়ে যায়।

না, মাসাইমারা ও কিরিংবাটি জঙ্গলে এরকম হয় না। হায়েনা মানুষের মত ‘মানবিক’ হতে পারে না। তারা দলবদ্ধ আক্রমণ করে ওয়াইল্ড বিস্টের টুঁটি চেপে ধরে একজন কেউ। শিকার মারা যায় অনেক কম বেদনাহীন হয়ে।

কিন্তু এই যাত্রাবুড়ির মাঠে যারা এই জঘন্য কাজটি করে তাদের মনে আদিম জিঘাংসার সাথে বহন করে চলে ‘এই বিশ্ব শুধু মানুষের’ —এই বিশ্বাস। বীরভোগ্যা বসুন্ধরার একজন বাসিন্দা ভেবে সে অন্য পশুর উপর সর্বোচ্চ পীড়নে পায় জীবনের চরম মোক্ষ।

নৃশংস এই হত্যা, নিরীহ মেষের প্রতি এরকম চরম অত্যাচারের প্রতিবাদে এগিয়ে আসেনি কেউ। রাজনৈতিক দল গুলি পপুলার সেন্টিমেন্টে কখনো ঘা দেয় না।

ফলে চলছে চলুক টাইপের এক পলায়নী মনোভাব নিয়েই চলে। পুলিশ প্রশাসন নির্বিকার, সংবাদ মাধ্যমের মুখে কুলুপ।

সবাই যেন একে অন্যের সাথে বোঝাপড়া করে চেপে যায় এই নারকীয় পশুহত্যা।

আজ সাহস করে এগিয়ে এলাম। আমি এই ঘটনার কথা আজই প্রথম শুনলাম। আগে শুনলে আগেই লিখতাম।

সবাই এগিয়ে আসুন। এর বিরুদ্ধে এক জনমত তৈরি করি আমরা৷ জাতি ধর্ম বর্ণ রাজনীতি নির্বিশেষে এই আদিম যুগীয় প্রথাটির বিরুদ্ধে সোচ্চার হই।

 

লেখাঃ যাদব কুমার পান্ডে